খেলার সংবাদ

আইপিএলে ডিজিটাল জুয়ার নাম Bet365

✍️ সাদিকুর হৃদয়

দিন কয়েক আগে শুরু হয়েছে ‘বহুপ্রতীক্ষিত’ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ-আইপিএল। করোনা ভাইরাসকে পাশ কাটিয়ে, দেশের বাইরে গিয়ে আরব আমিরাতে এবারের আইপিএল আয়োজন করেছে বিসিসিআই (ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড)। কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি এড়াতেই এমন করোনা মহামারীর মধ্যে ক্রিকেট টুর্নামেন্টটি আয়োজনের সাহস দেখিয়েছে দেশটির বোর্ড।

বিসিসিআই তাদের ক্ষতি এড়াতে এই সাহস দেখালেও, আরেক পক্ষ সেটি লুফে নিচ্ছে অন্যভাবে। মূলত, বিশ্বজুড়ে সব ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোর জন্যই তারা অধীর আগ্রহে বসে থাকে। কেননা, এ সময়টাতেই যে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হওয়ার সুযোগটি আসে তাদের সামনে

কথা হচ্ছে, জুয়াড়িদের নিয়ে। সময় পাল্টেছে, যুগ বদলেছে-বদলেছে তাদের জুয়া খেলার ধরন। একটা সময় থ্রি কার্ড, ফ্লাশ, হাউজি ইত্যাদি খেলায় বা ক্যাসিনো অথবা অন্যান্য লোকাল খেলায় মানুষ বাজি ধরলেও এখন তা লাগাচ্ছে ক্রিকেটের প্রতিটি বলে। যুগ যেমন ডিজিটাল, তেমনি ডিজিটালাইজেশন হয়েছে জুয়া খেলার ধরনেও। এখন চলছে ‘ডিজিটাল জুয়া’।

মুঠোফোন-টেলিভিশন-ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন খুব সহজেই যে কেউ আপডেট রাখতে পারছে যেকোনো ম্যাচের। কোনো ক্রিকেট ম্যাচ মানেই পাড়া-মহল্লায় দোকানের সামনে ভিড়। সেই ভিড় যত না ক্রিকেট উৎসুকদের, তার চেয়ে বেশি জুয়াড়িদের। প্রতিটি বলে ধরা হয় বাজি। এতে এক পক্ষ হয়তো অল্প সময়েই বিশাল অঙ্কের অর্থ পকেটে পুরছে, তবে আরেক পক্ষ হচ্ছে নিঃশেষ।

এবারের আইপিএল শুরুর পর সরেজমিন তদন্ত করে দেখা গেছে, মহামারী করোনার মাঝেও যেন প্রাণের ভয় নেই জুয়াড়িদের মনে। জটলা হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্টে। যেখানে টেলিভিশন, সেখানেই মানুষ। সেটা টেলিভিশনের শো-রুম হোক, হোক চায়ের দোকান কিংবা সেলুন। সবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুঠোফোন (মোবাইল) ও টেলিভিশনে। দুই বছর আগ পর্যন্ত ম্যাচ প্রতি বাজি ধরলেও, এখন জুয়াড়িরা এমন বেপরোয়া যে-বল বাই বল বাজি লাগাচ্ছে।

হাতে হাতে যেমন জুয়া খেলা হচ্ছে, তেমনি হচ্ছে অনলাইনেও। ‘বেট ৩৬৫ লাইভ’ বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত একটি বেটিং সাইট। এর একটি অ্যাপসও আছে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পুরোপুরি নিষিদ্ধ হলেও, এই প্রতিবেদক অন্তত ১০ জনের মুঠোফোনে দেখতে পেয়েছেন অ্যাপসটি ইন্সটল করা।

বলা বাহুল্য, সেখানে প্রায় সবাই খেলা দেখছিল বাজি লাগাতে। জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন তরুণ জানান, ভিপিএন-প্রক্সি অথবা ডেভেলপারদের সাহায্য নিয়ে তারা অবৈধ অ্যাপসটি মুঠোফোনে ইন্সটল করে জুয়া খেলছেন। একদল ফ্রিল্যান্সার আছে যাদের কাজই হচ্ছে, অবৈধ কাগজপত্র বানিয়ে বেট ৩৬৫ লাইভে অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া। সাধারণত এখানে অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই করতে গেলে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বাড়ির বিদ্যুৎ বিল থেকে শুরু করে আরো বেশ কিছু জটিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু তারা মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে জাল কাগজপত্রে অ্যাকাউন্ট খুলে দিচ্ছে।

এই সাইট বা অ্যাপসে বাংলাদেশি মুদ্রায় বাজি ধরা যায় না। বাজি ধরতে প্রয়োজন হয় ডলার বা ইউরোর। অ্যাকাউন্ট ভেরিফায়েড হওয়ার পর এবং নিজের অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা করার পর বাজি ধরা যায়। বেটিং সাইটে লেনদেন হয় মূলতÑপেপাল, মাস্টার কার্ড, ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। তবে যাদের এই কার্ড নেই, তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছে আরো একটি অসাধু ‘ব্যবসায়ী’ চক্র। এরা ‘এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করে।

মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, নগদ, রকেট, ডিবিবিএলের মাধ্যমে বাংলাদেশি মুদ্রার বিনিময়ে ডলার বা ইউরো গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ডিপোজিট করে তারা। বিশাল অঙ্কের একটা লাভও আছে এখানে তাদের। গতকালের বাজারদর অনুসারে প্রতি এক ডলার বাংলাদেশি মুদ্রায় দাম ছিল ৮৫ টাকা ০৫ পয়সা। অথচ এক এজেন্টের সঙ্গে দেন-দরবার করে জানা গেল, উনি প্রতি ডলার বিক্রি করছেন ১১০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি ডলারে ২৫ টাকা করে লাভ করছেন তিনি।

ক্রিকেট ছাড়াও ফুটবল, টেনিস, গলফ, ঘোড়দৌড়সহ আন্তর্জাতিক সব ধরনের খেলাই বেটিং সাইটের অন্তর্ভুক্ত। গ্রাহকদের সহায়তা করতে সাইটটিতে থাকে ২৪ ঘণ্টার হেল্পডেস্ক। করা যায় লাইভ চ্যাট। আবার এ সাইটটির অ্যাকাউন্টও বিক্রি হয়। ১৮ বছরের নিচের কোনো শিক্ষার্থী এই সাইটটিতে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে না। ফলে ওই ছাত্ররা বাজি খেলতে দুই থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছ থেকে অ্যাকাউন্ট কিনেও নেয়।

শুধু ছাত্র নয়, তরুণ-যুবক এমনকি বৃদ্ধ- কমবেশি অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে এ রকম ডিজিটাল জুয়ার সঙ্গে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থী, দিনমজুররা এ ধরনের অপকর্মে সবচেয়ে বেশি জড়িত। শুধু ঢাকা নয়, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে এ অপরাধ এবং অপরাধী চক্র।

বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলোজিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই শিক্ষার্থী জানান, ২০১৭ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে নিয়মিত বেট ৩৬৫ অ্যাপসে বাজি ধরছেন তিনি। তার নিজস্ব অ্যাকাউন্ট আছে, এমনকি টাকা দেনদেনের জন্য বিশ্বস্ত লোকও আছে।

তিনি বলেন, ‘আড়াই হাজার টাকায় অ্যাকাউন্ট খুলি আমি। আমার এক পরিচিত ফ্রিল্যান্সার ওয়েব ডেভেলপার আছে। সে-ই আমাকে অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। তাদের কাছে ভুয়া পাসপোর্ট, ভোটার আইডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স আগে থেকেই বানানো থাকে। এমনকি টাকার লেনদেনও তার মাধ্যমে করি। আমার স্ক্রিল অ্যাকাউন্টও তারই খুলে দেয়া।’

বাংলাদেশে বেট ৩৬৫ সাইট বন্ধ হলেও কিভাবে চালাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটাও নিয়ন্ত্রণ করে ওই এজেন্টরা। আমার কাছে এখনো প্রায় ১০-১২টা সচল লিংক আছে। ওই লিংক দিয়ে ঢুকলেই সরাসরি অ্যাকটিভ সাইটে ঢুকে যাওয়া যায়।’

এসব এজেন্ট বাদে আরো একটি চক্র আছে, যারা অন্যকে বাজি লাগাতে সাহায্য করে। যাদের বেট ৩৬৫ লাইভে অ্যাকাউন্ট নেই বা বাংলাদেশ থেকে ঢোকার পন্থা যার জানা নেই- তারাই এই চক্রের খপ্পরে পড়ে। আইপিএলের এবারের চতুর্থ ম্যাচে লড়ছিল চেন্নাই সুপার কিংস ও রাজস্থান রয়্যালস।

ক্রিকেটপাড়া খ্যাত মিরপুরে এক চায়ের দোকানে লক্ষ করে দেখা গেল, খোদ দোকানির হাতে মুঠোফোন আর সেখানে বেট ৩৬৫ লাইভ অ্যাপসটি চালু করা। জুয়াড়িরা তাকে দিয়েই বাজি লাগাচ্ছে। দোকানির লাভটা শুনলেই ভিড়মি খাবেন যে কেউ।

তাকে প্রশ্ন করতেই প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করলেও পরে বললেন, ‘আমি একজনের হয়া এক হাজার ট্যাকা লাগাইছি। জিতলে ছাব্বিশ শ ট্যাকা আইব। চুক্তি অনুযায়ী ছয় শ আমার। বাকি দুই হাজার যে ট্যাকা লাগাইছে তার। তয় লস হইলে কিন্তু পুরাটাই ওই লোকের। এতে আমার কোনো লস না, দায়ও নাই।’

কেউ কেউ পথের ফকির হলেও, অবৈধ এই বেটিং সাইটে জুয়াড়িদের আরো বেশি আকৃষ্ট হওয়ার কারণ, এর ব্যবসায়িক পলিসি। এখানে পয়েন্ট অনুযায়ী লাভ। এবারের আইপিএলের উদ্বোধনী ম্যাচে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের পয়েন্ট ছিল ১.৮ আর তাদের প্রতিপক্ষ চেন্নাই সুপার কিংসের ২.০। যেটা অ্যাপস কর্তৃপক্ষই নির্ধারণ করে থাকে।

ধরা যাক, কেউ মুম্বাইয়ের জন্য এক হাজার টাকা বাজি ধরল। জিতলে সে পাবে এক হাজার ৮০০ টাকা। অনুরূপভাবে, চেন্নাইয়ের হয়ে কেউ এক হাজার টাকা বাজি ধরলে পাবে দুই হাজার টাকা। অর্থাৎ পয়েন্টের সঙ্গে বাজি লাগানোর অর্থ গুণ হয়।

সর্বোপরি, ক্রিকেট আর অনলাইন বেট যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান সমাজে। আইনের চোখে দোষী হলেও প্রযুক্তি আইন যেন বড়ই দুর্বল তাদের রোধে। নয়তো, অবৈধ একটি সাইটে কিভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তরুণ-যুবক-ছাত্ররা? যেখানে এই সাইট বা অ্যাপসটি এ দেশে চলারই কথা নয়, সেখানে দেদারসে এর মাধ্যমে প্রতিদিন লাখো-কোটি টাকা পকেট থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি অসাধু চক্র? এরা কারা? এদের কি আদৌ আইনের আওতায় আনা সম্ভব? যেখানে সারা দেশে সব ধরনের জুয়া খেলাই নিষিদ্ধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট, সেখানে প্রকাশ্যেই এমন অপরাধ দেশের প্রযুক্তি আইনের দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

এসব বিষয়ে কথা বলতে দায়িত্বশীল পর্যায়ে যোগাযোগ করে মানবকণ্ঠ। নিষিদ্ধ এই বেটিং সাইট বন্ধে দেশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট কোনো কাজ করছে কি না তা জানতে যোগাযোগ করা হয় যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের আইসিটি বিভাগের সঙ্গে কথা হলে জানা যায়, এটি তাদের কাজ নয়।

পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কাজ করেন তারা। পরামর্শ দেয়া হয় সিআইডির সাইবার ক্রাইম সেন্টারে আলাপ করে দেখতে। এরপর সেখানে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি এই ডিপার্টমেন্টে নতুন। এ সম্পর্কে আমার খুব একটা ধারণা নেই।’ এরপর পুলিশ ফোনবুথ থেকে সিআইডির আরেক কর্মকর্তার নম্বর সংগ্রহ করে তার সঙ্গে আলাপ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এই ডিপার্টমেন্টে আর নেই।’

দুই কর্মকর্তাকেই নাম জিজ্ঞেস করতেই অজানা কারণে এড়িয়ে যান তারা। পরে একটি নম্বর দিয়ে বলেন, ‘এই নম্বরে যোগাযোগ করে দেখতে পারেন।’ তার দেয়া মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও অপর প্রান্ত থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button