ক্যাম্পাস নিউজপাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষা

করোনাকালীন সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা ও আমাদের করণীয়।

করোনা ভাইরাস তথা কোভিড-১৯ বর্তমান সময়ে এক বহুল আলোচিত বিষয়। এই মহামারি থমকে দিয়েছে পুরো বিশ্ব, মানবজীবনের গতিপথ দিয়েছে বদলে। করোনা ভাইরাস এর প্রথম সংক্রমন দেখা দেয় চীনের উবেহ প্রদেশের উহান শহরে। বর্তমান বিশ্ব এমন এক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে যার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না, ছিলো না কোন জানাশোনা, ছিলো না পূর্বপ্রস্তুতি।বাংলাদেশে করোনার প্রথম সংক্রমন দেখা দেয় ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জে ৩ জন ব্যক্তির দেহে করোনা শনাক্তের মধ্যে দিয়ে যারা ইতালি ফেরত ছিলেন। মহামারি কোভিড এমন একটি ভাইরাস যার কোন প্রতিষেধক এখনো বের হয়নি। এই ঘাতক ব্যাধি এমনই যে খুব সহজেই একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে তার সংস্পর্শে আসা সুস্থ ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে। করোনা ভাইরাসের ফলে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।বিশ্বের ২১৩ টি দেশে করোনা ভাইরাস বিস্তার লাভ করেছে। এই মহামারি মানবজাতির জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে অনেকটা। চীনদেশে যখন করোনা শনাক্ত হয় তখন ৪১ জনের দেহে এ রোগ শনাক্ত হয়।২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর করোনার প্রথম ফলন হয় আর অনেক গবেষণা শেষে বিজ্ঞানীরা এর নামকরণ করেন নভেল করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৪৭৯ জন ব্যক্তির দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ৫ হাজার ২৫১ জন ব্যক্তির।করোনা ভাইরাসের কবলে থমকে আছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা সহ অন্যান্য দিকগুলো। করোনা ভাইরাস স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি অর্থনীতির জন্য রীতিমতো হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব যখন হাতছানি দিচ্ছিল ঠিক এমন সময় করোনার হানা এক বড় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে অর্থনৈতিক অবস্থা। তেমনি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে মহামারি কোভিড।একটি আদর্শ জাতি গঠন করেন শিক্ষকরা আর যাদের দ্বারা গঠিত হয় তারা হলেন শিক্ষার্থী।সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আদর্শ জাতি গঠনের জন্যও চ্যালেঞ্জিং বিষয়। শিক্ষাব্যবস্থা অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর যেখানে সুদৃষ্টি দেয়া অবশ্য দরকার। মহামারি করোনা এমন একটি রোগ যার জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হয়।তাই করোনাকালে বিকল্প চিন্তাধারা অবশ্য দরকার। আর কবে নাগাদ এ ভাইরাস বিদায় হবে তা বলা যাচ্ছে না, প্রতিষেধক এখানো আসেনি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য করোনা এক বড় নেতিবাচক  প্রভাব ফেলবে  যদি না কোন বিকল্প কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করা সম্ভব হয়।
করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থাঃ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সরকার ইতোমধ্যে বেশকিছু ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে কি কি ব্যবস্থা গ্রহন করা যায় এজন্য শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। এ সময়ে বিকল্প পদ্ধতি নির্ধারণসহ এর কার্যকারীতার দিকটি বিশেষ নজরে রাখতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে অনলাইন ক্লাসের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে।শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনলাইন ক্লাস চালুর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। বর্তমানে চলমান কার্যক্রম –
১/ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য অনেক আগে থেকেই সংসদ টেলিভিশন এর মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছে।
২/ দেশের কলেজগুলো নিজস্বভাবে অনলাইন ক্লাস চালু করেছে।অনলাইন ক্লাসের মাধ্যম হিসেবে গুগল ক্লাসরুম,গুগল মিট, জুম অ্যাপের মাধ্যমে ক্লাস, ফেসবুক লাইভ এর মাধ্যমে ক্লাস নিচ্ছে। ইউটিউব চ্যানেলে ক্লাসগুলোর ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে যাতে করে কেউ ক্লাসে অংশগ্রহণ না করতে পারলে পরবর্তী তে দেখে নিতে পারে।
৩/ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশ কয়েকটি অনলাইন ক্লাস শুরু করেছে এবং বাকিদের ইউজিসি অনলাইন ক্লাসের দিকে আসার আহ্বান করেছে।
অনলাইন ক্লাসের সীমাবদ্ধতাঃ অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রেও বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।অনলাইন ক্লাস চালু করে ক্ষান্ত হলেই চলবে না।ক্লাসের রিচ কত হলো, কার্যকারিতা কতটুকু হলো এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তা না হলে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ পিছিয়ে থাকবে বলে মনে করছি।
১/ ডিভাইস সমস্যাঃ আমাদের দেশ উন্নয়নশীল একটি দেশ।তাই সকল শিক্ষার্থীর কাছে অনলাইন ক্লাসের উপকরণ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব, নোটবুকের মতো ডিভাইস নেই এবং ক্রয়ের সক্ষমতা নেই। যার ফলে সবাই অনলাইন ক্লাস করতে সমর্থ হচ্ছে না।
২/ নেটওয়ার্কজনিত সমস্যাঃ আমাদের দেশের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা সমৃদ্ধ নয়।আবার ইন্টারনেট সংযোগ থাকা স্বত্তেও এর স্পিড নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাই অনলাইন ক্লাসে যোগদান করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসে যেখান থেকে অনলাইন ক্লাসের কথা চিন্তা করাও দুষ্কর।
৩/ ডাটা/মেগাবাইট সমস্যাঃ অনেক শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন থাকা স্বত্তেও অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পারছে না মেগাবাইট/ডাটা ক্রয়ের সক্ষমতা না থাকায়।করোনাকালীন অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবনধারণ কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে যেখানে  তাদের সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যয় নির্বাহ দুঃসাধ্য।
আমাদের করণীয়ঃ করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের অবশ্য করণীয় রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমাদের অবশ্য বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে এবং সে অনুযায়ী আগাতে হবে। এ সময়ে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার দিকে যাতে করে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।আর এজন্য গৃহীত পদক্ষেপ এর যথাযথ বাস্তবায়নের দিকে সবার সুনজর দিতে হবে।যেসব ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারি –
১/ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের স্মার্টফোন ক্রয়ে সক্ষমতা নেই তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে।
২/ স্মার্টফোন থাকার পরেও যাদের ডাটা ক্রয়ে সক্ষমতা নেই তাদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা প্রদান করতে হবে।
৩/ যেসব এলাকায় নেটওয়ার্কের কানেক্টিভিটি দুর্বল তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। আর সব এলাকায় সকল অপারেটরের নেটওয়ার্ক সমস্যা নেই তাই অঞ্চলভিত্তিক তাদের যে অপারেটরে নেটওয়ার্ক কানেকশন ভালো সে অপারেটরে বিনামূল্যে সুবিধা দিতে হবে।
৪/ করোনাকালীন গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা তহবিল গঠন করতে হবে এবং এই তহবিল থেকে সমস্যানুযায়ী সহায়তা প্রদান করতে হবে।
৫/ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যয়বহন করতে পারে। যেমনঃ কাগজ-কলম, বই-পুস্তক ক্রয়ে সমস্যা না হয়।
৬/ যতদ্রুত সম্ভব সরকারি পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মতামত নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৭/ আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই করোনা স্থায়ী হলে কিভাবে আগাতে হবে এমন কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।
৮/ যতদ্রুত মূল্যায়ণ পদ্ধতি, শিক্ষার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে ততদ্রুত শিক্ষার বর্তমান অচলাবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে।
৯/ যদি করোনা পরিস্থিতি আগামী ২/১ মাসে স্বাভাবিক হয় (সম্ভাবনা খুব কম) তাহলে সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষাবর্ষ সমাপ্ত করতে হবে এবং এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা করে রাখতে হবে।
১০/ টেলিটক অপারেটর শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসের সুযোগের কথা জানিয়েছে কিন্তু টেলিটক ইউজার খুব কম।আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে টেলিটকের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা খুব দুর্বল যার ফলে এ সুবিধার কার্যকারিতা তেমন একটা হবে বলে মনে করছি না।এক্ষেত্রে অন্য অপারেটরে সুবিধা দিতে হবে।
১১/ স্কুলপর্যায়ে যে সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে ক্লাস চলমান রয়েছে তার পরিচিতি বাড়াতে হবে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে যতদিন না শ্রেণি কক্ষে ক্লাস করানো সম্ভব হয়।এটি একটি সময়োপযোগী ও যথাযথ ব্যবস্থা বলে মনে করছি।
১২/ অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত নয় বলে অনেকের মধ্যে অনীহা দেখা যায়। এজন্য তাদের সম্পৃক্ত করতে বর্তমান সময়ের পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাসের কোন বিকল্প নেই এমনটা  বুঝাতে হবে।পাশাপাশি এসাইনমেন্ট দেয়া যেতে পারে যাতে করে শুধু ক্লাসে যোগদান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না থাকে।
১৩/ অনলাইন ক্লাসে পড়ানো টপিকগুলো পিডিএফ বা ডক আকারে শিক্ষার্থীদের দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে পরবর্তী তে দেখার সুযোগ হয়।
১৪/ যেহেতু অনলাইন পাঠদান পদ্ধতির সাথে শিক্ষকরা পরিচিত নয় সেজন্য তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে করে শিক্ষকরা যথাযথ পাঠদানে সমর্থ হয়।
১৫/ শিক্ষাবিষয়ক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত ”রিকোভারি টিম” কাজ করে চলছে। তাদের যতদ্রুত সম্ভব পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা প্রকাশ করতে হবে।
করোনার বেড়াজালে আমরা বন্দী। আর এর স্থায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের অজানা,  তাই যদি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন সম্ভব না হয় তাহলে শিক্ষাখাতের জন্য তা বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।তাই আমাদের সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থার অচলাবস্থা দূরীকরণে খুব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
মোঃ আসাদুল আমীন
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button